মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত অভিযান - ইসলামী ইতিহাস

 হক ও বাতিলের লীলাক্ষেত্র এই পৃথিবী। আবহমান কাল থেকেই হক ও বাতিলের সংঘাত চলে আসছে এখানে। পরিণামে হক ও সত্যকেই সব সময় বিজয়ী ও সমুন্নত রেখেছেন আল্লাহ পাক। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমরের চেতনাকে বুকে ধারণ করে খালিদ বিন ওয়ালীদের উম্মতের যে সকল সূর্যসন্তানেরা ইশ’আতে দ্বীনের বলিষ্ঠ কণ্ঠে  গর্জে উঠেছে। তাদের মাঝে মুহাম্মদ বিন কাসেম চিরস্মরণীয় ও আদর্শ।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত অভিযানের প্রেক্ষাপট:

উমাইয়া খলীফা প্রথম ওয়ালীদের শাসনামলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসমূহের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। হাজ্জাজের শাসনাধীন এলাকার কতিপয় বিদ্রোহী আরব সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের সিন্ধু অঞ্চলে প্রবেশ করলে তথাকার শাসনকর্তা রাজা দাহির তাদেরকে আশ্রয় দেয়। হাজ্জাজ বিদ্রোহী পলাতকদের প্রত্যাবর্তনের দাবি জানিয়ে রাজা দাহিরের নিকট পত্র পাঠালে সে তা প্রত্যাখ্যান করে। অপর দিকে সিংহলে বাণিজ্যরত যেসব আরব বণিক সিংহলে মারা যায়, তাদের পরিবার পরিজনকে স্বদেশে পাঠানাের জন্য সিংহল রাজ ব্যবস্থা করেন এবং পূর্বাঞ্চলীয় গভর্নর হাজ্জাজের জন্য বহু মূল্যবান উপঢৌকনসহ আটটি জাহাজ প্রেরণ করেন। সিন্ধুর সামুদ্রিক বন্দরের নিকট তথাস্তু জলদস্যুদের দ্বারা মুসলমানদের সে আটটি জাহাজ লুণ্ঠিত হয় এবং যাত্রীদের উপর চরম নির্যাতন করতঃ তাদেরকে বন্দী করে রাখা হয়। বন্দীদের মুক্তি ও তৎসহ লুণ্ঠিত সকল সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য এবং জলদস্যুদের শায়েস্তা করার জন্য হাজ্জাজ রাজা দাহিরের নিকট অনুরােধ জানিয়ে পত্র পাঠান। কিন্তু রাজা দাহির এতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে হাজ্জাজ রাজা দাহিরের ধৃষ্টতার সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য উবায়দুল্লাহ ও বুদাইলের নেতৃত্বে পর পর দুটি অভিযান প্রেরণ করেন।

Muhammad bin Qasim's Expedition to India - Islamic History. মুহাম্মদ বিন কাসিমের ভারত অভিযান - ইসলামী ইতিহাস।

মুহাম্মদ বিন কাসিমের সঙ্গে রাজা দাহিরের যুদ্ধ:

 পর পর দুটি অভিযানে ব্যর্থ হলে স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা সপ্তদশ বর্ষীয় তরুণ সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে তৃতীয় অভিযান প্রেরণ করেন। ছয় হাজার অশ্বারোহী ও সমপরিমাণ উষ্ট্র বাহিনী সঙ্গে নিয়ে মুহাম্মদ বিন কাসিম ভারত অভিমুখে রওনা করেন। পথে মাকরানের অধিপতির পক্ষ থেকে আরও একদল সৈন্য তিনি সাহায্য হিসাবে পেয়ে যান। তাছাড়া হিন্দু শাসকদের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ ও বিক্ষুদ্ধ জাঠ ও মেডদেরকেও তিনি তার সহযােগী হিসাবে পেয়ে যান। ৭১১-১২ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক সময় ইসলামী আদর্শে স্নাত এই বিশাল বাহিনী দুবাইল বন্দরে এসে পৌছে। ব্রাহ্মণ ও রাজপুতদের দ্বারা পরিবেষ্টিত এই নগরে হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে তুমুল লড়াই হয়। আল্লাহ তা'আলা মুসলমানদেরকে বিজয়ের গৌরব দান করেন। অতপর মুহাম্মদ বিন কাসিম ক্রমান্বয়ে বর্তমান হায়দারাবাদের নিকটস্থ নিরুন নগরী, সিওয়ান ও সিসাম এলাকাসমূহ দখল করে নেন। হিন্দুরা প্রাণপণে লড়াই করলেও অবশেষে তারা মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাস্ত হয়। যুদ্ধে রাজা দাহির নিহত হয়, তার স্ত্রী ও পুত্ররা রাওয়ার নামক দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার গ্লানি থেকে আত্মরক্ষার জন্য সহচরীবৃন্দ সমেত আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়। মুহাম্মদ বিন কাসিম ব্রাহ্মণাবাদ, আলাের ও মুলতান অভিমুখেও অভিযান পরিচালনা করেন এবং বিজয়ের গৌরব নিয়ে ফিরতে সক্ষম হন। এভাবে রাজা দাহিরের সমগ্র রাজ্য মুসলমানদের করতলগত হয়। 

আল্লাহর প্রতি মুসলমানদের ঈমান ও আস্থা, উন্নত নৈতিকতা, সুষ্ঠু পরিচালনা, আক্রমণ কৌশল, রণদক্ষতা এবং ক্ষমতাসীনদের জুলুম ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ ও ইসলামের সুমহান আদর্শে বিমুগ্ধ জনতার সহযােগিতাই মুসলমানদের বিজয়ের পথকে সুগম করেছিল নিঃসন্দেহে। মুলতান বিজয়ের পর মুহাম্মদ বিন কাসিম যখন কনৌজ দখলের জন্য সেনাপতি আবু হাকীমের নেতৃত্বে দশ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী প্রেরণের আয়োজন করেছিলেন, ঠিক তখনই দামেস্কের শাসনক্ষমতায় 'বদল হয়। নবনির্বাচিত উমাইয়্যা খলীফা সুলায়মান ক্ষমতায় বসেই গৌত্রিক প্রতিহিংসা বসতঃ মুহাম্মদ বিন কাসিমকে দামেস্কে তলব করে নিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করেন। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। 

মুহাম্মদ বিন কাসিম পরবর্তী শাসকবর্গ:

মুহাম্মদ বিন কাসিমের মৃত্যুর পর খলীফা সুলায়মান ইয়াযিদ বিন মুহাম্লাবকে সিন্ধু অঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। ক্ষমতার রদবদলের কারণে মুহাম্মদ বিন কাসিম কর্তৃক বিজিত অনেক এলাকাই মুসলমানদের হস্তচ্যুত হয়ে যায়। এদিকে ইয়াজীদ বিন মুহাল্লাব অল্প কালের মাঝে মৃত্যু বরণ করলে তাঁর ভ্রাতা হাবীব শাসনভার প্রাপ্ত হন। খলীফা হিশামের রাজত্বকালে আল-হাবীবের স্থলে জুনায়েদ (৭২৪ খ্রঃ) শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বীরদর্পী শাসক। তাই তিনি মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিজিত এলাকা পুনরুদ্ধার ও তার আরাধ্য কার্য সুসম্পন্ন করার জন্য রাজ্য সম্প্রসারণ নীতি গ্রহণ করেন এবং ৭৩৮ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে বিপুল জনসমর্থন লাভের মধ্য দিয়ে ভারতের অনেক এলাকা জয় করেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরাধীকারীদের সময় সিন্ধু অঞ্চলে মুসলমানদের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। এমনকি আল জুনায়েদের পর আরব শাসনকর্তা তামিনের রাজত্বকালে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের এদিকে মুলতান ব্যতীত ভারতের সমগ্র এলাকাই মুসলমানদের হস্তচ্যুত হয়ে যায়। এসময় বিজিত এলাকাসমূহকে তঙ্কালের খােরাসান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হত। 

হিজরী দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সিন্ধুর এই অঞ্চল নিয়মিতভাবে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীন থাকে। পরে এই অঞ্চল কেন্দ্রীয় শাসনমুক্ত হয়ে অনেকগুলাে ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। হিজরী তৃতীয় শতকের এদিকে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাজন্যবর্গের উপর্যুপরি চাপের মুখে এসকল ক্ষুদ্র রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ক্রমান্বয়ে সেখানে শিয়া মতালম্বী বাতেনিয়্যাহ সম্প্রদায়ের লােকদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দীর্ঘদিনের জন্য ভারতীয় অঞ্চলের সাথে মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হিজরী পঞ্চম শতকের প্রথম দিকে সুলতান মাহমুদ গজনভী কর্তৃক ভারত আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত অবস্থা এভাবেই চলতে থাকে। পারস্পরিক গমনাগমনের মাধ্যমে এ দেশের নওমুসলিমরা আরবীয় অঞ্চলে গিয়ে দ্বীন শিক্ষায় নিরত হয় এবং আরবীয় অঞ্চলের লােকেরা এদেশে অবস্থান করে স্বধর্মের প্রচার, ইসলামী তাহজীব তামাদুন ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যায়। তাদের হাতে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং ইসলাম এ দেশের মানুষের অন্তরে শ্রদ্ধা ও সম্মানের আসন লাভ করতে থাকে। এ সময় বহু তাবেয়ীন এ দেশে এসেছিলেন আবার বহু ভারতীয় লোক সাহাবীদের সান্নিধ্য লাভ করে তাবেয়ী হওয়ার সুযােগ লাভ করে ছিলেন। 

যদিও প্রথম দিককার এ সকল অভিযান রাজনৈতিকভাবে কোন দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনতে সক্ষম হয়নি, তথাপি এ কথা সত্য যে, এ সকল অভিযান উপলক্ষে বহু সাহাবী ও তাবেয়ী এ দেশে আগমন করেছিলেন। তাদের অনেকেই এ দেশে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করতঃ ইসলাম ও ইলমে দ্বীনের ইশাআতে নিরত হন। তাদের হাতে নব দীক্ষিত মুসলমানদের অনেকেই আরবীয় অঞ্চল তথা মক্কা মদীনায় গমন করে সেখান থেকে ইলমে দ্বীন অর্থাৎ কুরআন ও হাদীসের জ্ঞান অর্জন করে কেউবা সেখানেই থেকে গেছেন; আবার অনেকেই স্বদেশে ফিরে এসে ইসলামের প্রচার ও দ্বীনি ইলমের ইশা'আতের কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। তাই তাবেই-তাবেঈনদের তালিকায় অনেক ভারতীয় মনীষীরও নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসাবে আবু মাশার নজীহ সিন্ধীর নাম উল্লেখ করা যায়- যিনি সিন্ধুর অধিবাসী ছিলেন, আরবীয় অঞ্চলে গমন করে ইলমে দ্বীন তথা ইলমে হাদীস অর্জন করেন এবং আরবেই (বাগদাদে) জীবন অতিবাহিত করেন।

Post a Comment

Thank you for your valuable feedback. We will review your feedback soon.

Previous Post Next Post